অন্ধকার কেটে আলো আসবেই, সাহসে বুক বাঁধি


সাব্বিরুল ইসলাম সাবু 


১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি ক্লাস সেভেনের ছাত্র। মুক্তিযুদ্ধের ৯টি মাস পার করেছি ভয়, আতঙ্কে। ওই ৯ মাসের স্মৃতি কখনো ভুলার নয়। ভয়, আতঙ্কের সাথে ছিল অনিশ্চয়তা। একটাই চিন্তা ছিল কবে হবে এর শেষ। আমার ভাগ্য ভালো আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা ৯ মাসেই দেশকে স্বাধীন করেছিলেন। আমার জীবনে অন্ধকারের পর আলো এসেছিল।

করোনাভাইরাসের কারণে ২০২০ সালে এসে আবার একটা সঙ্কট সময় পার করছি। কেবল আমার দেশেই নয় বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে এই মরণঘাতি ভাইরাস। কাকতালীয়ভাবে এই সঙ্কটের সময় আমার মেয়েও ক্লাস সেভেনের ছাত্রী। স্কুলে যাওয়া বন্ধ। খেলাধুলার মাঠে যাওয়া নিষেধ। বন্ধুদের সাথেও দেখা হয় না। ঘরবন্দি দিন কাটাচ্ছে। সে ক্ষুব্ধ, বিরক্ত, অস্থির, হতাশ। আমার কাছে তার একটাই প্রশ্ন, কবে হবে এর শেষ। নিশ্চিত উত্তর দিতে পারি না। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি কিভাবে দিন কাটিয়েছি সেই সময়ের কথা শুনিয়ে সাহস যোগানোর চেষ্টা করি কেবল। 

মুক্তিযুদ্ধের সময় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি মানিকগঞ্জ শহরের বাড়ি ছেড়ে আমাদের পুরো পরিবার অশ্রয় নিই বাবার এক বন্ধুর গ্রামের বাড়ি। মা, বড় দুই বোন, ফুফু, ফুপাত ভাইবোনসহ তেরো-চৌদ্দ জন। বাবা, বড় দুই ভাই মুক্তিযুদ্ধের মাঠে। দশ-পনের দিন পরপর বাবা আসলেও যোগাযোগ ছিলো না ভাইদের সাথে। এরমধ্যে খবর পেলাম আমাদের মানিকগঞ্জ শহরের বাড়িতে লুটপাট করেছে দালালরা। নজর রাখা হচ্ছে আমার বাবা, ভাইয়েরা কেউ বাড়ি আসেন কি না। শহরে আসলেই ধরিয়ে দেয়া হবে পাকিস্তানি মিলিটারিদের কাছে। আমরা যে গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিলাম মাঝে মাঝে সেই গ্রামের পাশ দিয়ে পাকিস্তানি মিলেটারির গাড়ি যাতায়াত করতো। তখন আমরাসহ গ্রামের লোকজন বিশেষ করে মহিলারা পাট ক্ষেতে আশ্রয় নিতাম। 

অনেকবার পুরো রাত কাটতে হয়েছে পাট ক্ষেতে। একসময় পাকিস্তানিদের দালাল গজিয়ে ওঠে ওই গ্রামে। বাধ্য হয়ে  আগস্ট মাসের শেষের দিকে আমরা সরে যাই আরও ভেতরের একটি গ্রামে। এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়িতে। মাটির মেঝে ছোট্ট একটা ঘরে গাদাগাদি করে থাকি। বাড়ির আঙিনার বাইরে যাওয়া নিষেধ। ঘরেই বসে থাকতে হয়। খাওয়া দাওয়াতেও ছিল কষ্ট। 

পেশায় ডাক্তার হলেও বাবা বেশির ভাগ সময় দিতেন রাজনীতিতে। স্বাভাবিক সময় যাও বা কিছু আয় করতেন মুক্তিযুদ্ধের সময় তাও ছিলো না। শহরের একটি বাড়ি ও দুটি দোকানের ভাড়াই সম্বল ছিল। কিন্তু সেই সময় নিয়মিত ভাড়া আদায় হচ্ছিল না। এতগুল মানুষের খাওয়া দাওয়া মা কিভাবে সামলাতেন এখনও বুঝি না। তবে মনে আছে ছাতু আর গুড় পানি দিয়ে মিশিয়ে মুঠি বানিয়ে আমাদের সকালের নাস্তা হতো।

মেয়েকে বলি, তুমি যেমন এখন ঘর থেকে বের হতে পারছো না, আমিও তখন ঘর থেকে বের হতে পারতাম না। এখনকার মত তখন ঘরে ঘরে টেলিভিশন ছিলো না। মোবাইল ফোন, ইনটারনেট কিছুই ছিলো না। আত্মীয় স্বজন, বন্ধু, বান্ধব, পরিচিতরা কে কোথায় আছে, কেমন আছে জানা সম্ভব হত না। তখনও এক ধরেনের লকডাউনে ছিলাম আমি। মা, বড় বোনদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বাইরে যাওয়া ছিল সমুদ্র পাড়ি দেয়া।  

মেয়েকে বলি, তখন করোনাভাইরাস ছিলো না। কিন্তু ছিলো নৃশংস পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আর তাদের দোসররা। তারাও তখন করোনাভাইরাসের চাইতে কম ভয়ঙ্কর ছিলো না। সন্দেহ হলেই কখন কাকে ধরে নিয়ে হত্যা করবে তার নিশ্চয়তা ছিলো না। মায়ের কোল থেকে সন্তানকে ছিনিয়ে হত্যা করেছে। বাছ বিচার না করে গণহত্যা চালিয়েছে। রাস্তা, ঘাটে, ডোবা, নালায় ফেলে রেখেছে লাশ। দাফন হয়নি। শেয়াল, কুকুরে খেয়েছে। 

মেয়েকে পরিসংখ্যান দিয়ে বলি করেনাভাইরাসে প্রায় সবকটি দেশেই ছড়িয়ে পড়েছে। আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ২৬ লাখ মানুষ। মৃত্যু হয়েছে পৌনে দুই লাখের মত। আথচ ৯ মাসের যুদ্ধে কেবলমাত্র বাংলাদেশেই ৩০ লাখ বাঙালিকে হত্যা করা হয়েছে। দুই লাখ নারী হয়েছে চরম লাঞ্ছিত। গ্রামের পর গ্রাম আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এক কোটি বাঙালি দেশ ছেড়ে পালিয়েছিল। ভিনদেশে তারা মানবেতর জীবন কাটিয়েছেন।

মেয়ের কাছে প্রশ্ন রাখি কোন সময়টি তার কাছে বেশি ভয়ের মনে হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংশতা নাকি করোনাভাইরাসকে। প্রশ্নের সাথে আরেকটু যোগকরে বলি তুমি যদি ঘরে থাক, অন্য আরেকজনের কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্ব থাক, মাস্ক পর, নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোও, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাক তা হলে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা পাবে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনারা খুঁজে খুঁজে বের করতো। পালিয়েও রক্ষা ছিলো না।
অধৈর্য্য মেয়ের পরিষ্কার উত্তর, করেনাভাইরাসকেই তার বেশি ভয়। নিজেই ব্যাখ্যা দিয়ে বলে, দেশ এখন স্বাধীন। পাকিস্তানি সেনারা তো কবেই পালিয়েছে। এখন আছে করোনাভাইরাস। তাই এটাই বেশি ভয়ের।

আমার বকবকানিতে বিরক্ত মেয়ে মোবাইলফোনে ফেসবুকে মনোযোগী হয়ে পড়ে। মেয়ের উত্তরের সাথে অমত হতে পারি না আমিও। কাছের সমস্যাই বড় করে দেখে সবাই। এটাই স্বাভাবিক। 
 
তবুও মুক্তিযুদ্ধের সময়কার কথা মনে আসে বারবার। সেসময় দল, মতের উর্ধে থেকে রাজনৈতিক নেতারা নেতৃত্ব দিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধারা সামনে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করেছে। আর সারা দেশর মানুষ ছিল তাদের পাশে। আশ্রয় দিয়েছে, খাবার দিয়েছে। প্রয়োজনে লুকিয়ে রখেছে। আর কিছু না পারুক ঘৃণা করেছে, অভিশাপ দিয়েছে হানাদার পাক সেনাদের। যার যার অবস্থান থেকে এককাট্টা হযেছে সবাই। 

মনে মনে বলি, মুক্তিযুদ্ধের সময়ের মত আমরা সবাই যদি করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধেও এককাট্টা হতে পারি। তা হলে নিশ্চয় বিজয় হবে। বিশ্বের বড় বড় বৈজ্ঞানিকরা করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার কৌশল শিখিয়ে দিচ্ছেন। আর মুক্তিযোদ্ধাদের মতই আমাদের ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ, সেনাবাহিনী, সাংবাদিকরা সম্মুখ যুদ্ধে আছে। বাকি সবাই যদি নিয়ম মেনে তাদের সহযোগিতা করি নিশ্চয় বিজয়ী হবো এই যুদ্ধেও। অন্ধকার কেটে আলো আসবেই বলে সাহসে বুক বাঁধি। 

লেখক : মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি, কালের কণ্ঠ            




Comments