মানিকগঞ্জের সড়কে মরণ মিছিল


মানিকগঞ্জের সড়কগুলায় প্রতিদিনই মাইনষে ছুটতেছে জীবিকার তাগিদে। কেউ যাইতেছেন কামে, কেউ গরে ফিরতেছেন, কেউ বাজারে, কেউ হাসপাতালে। কারও গন্তব্য স্কুল-কলেজ, কারও ব্যবসার দোকান। তয় এই স্বাভাবিক যাত্রার মইধ্যেই কখনো ট্রাক, কখনো বাস, কখনো কাভার্ডভ্যান, আবার কখনো মোটরসাইকেল অইয়া উঠতেছে মৃত্যুর কারণ।

গত এক বছরে মানিকগঞ্জের সড়ক দুর্ঘটনার প্রকাশিত খবরগুলা পর্যালোচনা কইরা অন্তত ২৯ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় শিশু থিকা শুরু কইরা কিশোর, তরুণ, দম্পতি, শ্রমজীবী মাইনষে, চালক, যাত্রী আর তৃতীয় লিঙ্গের মানুষও আছেন। আহত অইছেন আরু ম্যালা মানুষ। কোনো কোনো দুর্ঘটনায় এ্যাক্টা পরিবারের একাধিক সদস্য একসঙ্গে প্রাণ হারাইছেন।

সবচাইতে সাম্প্রতিক ঘটনাডা অইছে ৪ অক্টোবর সন্ধ্যায়। মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার জাগীর সেতুর কাছে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে বাসের ধাক্কায় বর্ষা (৪৫) নামে তৃতীয় লিঙ্গের এ্যাকজন মানুষ মারা যান। তিনি রিকশায় কইরা এ্যাকজন সঙ্গীর লগে যাইতেছিলেন। এ সময় পাশ দিয়া যাওয়া এ্যাক্টা যাত্রীবাহী বাস রিকশাডারে ধাক্কা দেয়। এতে বর্ষা সড়কে ছিটক্যা পড়েন এবং বাসের চাকায় পিষ্ট অইয়া ঘটনাস্থলেই মারা যান। তাঁর সঙ্গী কেয়া মনি (২৫) আর রিকশাচালক আহত অইছেন।

পুলিশ জানাইছে, দুর্ঘটনার পর বাসটি চইলা যায়। আহত কেয়া মনির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাসটি সেলফি পরিবহনের অইতে পারে বইলা ধারণা করা অইছে। বাসডা শনাক্ত করতে সিসিটিভি ফুটেজ দেহা অইতেছে।

এর মাত্র কয়েক দিন আগে, ২৬ সেপ্টেম্বর, শিবালয়ের টেপড়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে উল্টো দিক থিকা আইসা এ্যাক্টা বাসের ধাক্কায় মোটরসাইকেলে থাকা এ্যাক্টা নারী আর তাঁর ১০ মাসের শিশুকন্যা মারা যায়। শিশুডারে নিয়া বাবা-মা মোটরসাইকেলে গরে ফিরতেছিলেন। সেই ফিরাডাই অইয়া যায় পরিবারের লাইগ্যা শেষ যাত্রা। দুর্ঘটনায় শিশুটার বাবা গুরুতর আহত অইছিলেন।

এই ঘটনাডাই যেন গত এক বছরের সড়ক দুর্ঘটনার পুরা চিত্রডা সামনে নিয়া আসে। সড়কে খালি এ্যাকজন মাইনষে মারা যাইতেছেন না, অনেক সময় একসঙ্গে ভাঙ্যা পইড়া যায় এ্যাক্টা পুরা পরিবার।

গত ১৯ জুলাই শিবালয়ের বরঙ্গাইল বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে এ্যাক্টা বাস নিয়ন্ত্রণ হারাইয়া খালে পইড়া যায়। বাসের চাকা ফাইট্যা চালক নিয়ন্ত্রণ হারাইছিলেন বইলা পুলিশ জানাইছিল। এতে দেলোয়ার হোসেন নামে এ্যাকজন মারা যান। আহত অইছিলেন ১০ থিকা ১২ জন।

এর কয়েক দিন পর ২১ জুলাই সিংগাইরের মেদুলিয়া ডাবল ব্রিজ এলাকায় ট্রাক আর অটোরিকশার সংঘর্ষে মারা যান অজ্ঞাতপরিচয় এ্যাকজন। আহত অইছিলেন আরু তিনজন।

২৪ জুলাই ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে কাভার্ডভ্যানের ধাক্কায় মারা যান ফল ব্যবসায়ী শুকুর আলী। প্রতিদিনের ত্যাম্বাই ফলভর্তি ভ্যান নিয়া শহরের দিকে যাইতেছিলেন তিনি। জীবিকার লাইগ্যা বাইর অইয়া সেই পথডাই অইয়া যায় তার জীবনের শেষ পথ।

জুন মাসেও প্রাণ গেছে একাধিক মাইনষের। ১৮ জুন মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার মূলজান এলাকায় ট্রাকের লগে পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষে পিকআপের চালক আর সহকারী মারা যান। ১১ জুন বেউথা এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা আর মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে মারা যান ৬০ বছরের আবু তাহের।

মে মাস আছিল বিশেষ কইরা প্রাণঘাতী। ৮ মে সাটুরিয়ার উত্তর পাড়তিল্লী বিলপাড়া এলাকায় ট্রাক আর মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে তিন তরুণের মৃত্যু অয়। বিভিন্ন খবরে নিহতদের বয়স ১৬, ১৬ আর ২২ বছর কওয়া অইছে। একই দুর্ঘটনায় দুই কিশোরও প্রাণ হারাইছে।

২১ মে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ভাটবাউর এলাকায় গরুবাহী ট্রাকের লগে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে এ্যাকজন মারা যান। আহত অইছিলেন মোটরসাইকেলের দুই আরোহীসহ আরু কয়েকজন। ২৩ মে বরঙ্গাইল বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ট্রাকচাপায় মারা যান পান্নু নামে ৫০ বছরের এ্যাকজন মাইনষে।

মার্চেও সড়ক কাইড়া নেয় একাধিক প্রাণ। ৫ মার্চ সদর উপজেলার তেরদোনা এলাকায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা যান রুমান নামে এ্যাকজন যুবক। ১২ মার্চ শিবালয়ের বরঙ্গাইল বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে মোটরসাইকেল আরোহী স্বামী-স্ত্রী মোনায়েম খান আর জোসনা আক্তার মারা যান। একসঙ্গে এ্যাক্টা পরিবারের দুইজন মাইনষে চইলা যাওয়া যে কত বড় শূন্যতা তৈরি করে, এই ঘটনাডা তারই নির্মম উদাহরণ।

ফেব্রুয়ারিতেও আছিল একই চিত্র। ১৯ ফেব্রুয়ারি ঘিওরের বটতলা নতুন ব্রিজ এলাকায় মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারাইয়া খুঁটিতে ধাক্কা দিলে কলেজছাত্র আশিক মারা যান। পরদিন সিংগাইর-মানিকগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কে পিকআপ আর ডাম্পট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে পিকআপচালক গিয়াস উদ্দিন মারা যান।

জানুয়ারির শুরুতেই সিংগাইরে প্রাণ হারায় দুই শিক্ষার্থী। ২ জানুয়ারি হেমায়েতপুর-সিংগাইর-মানিকগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কের গেড়াদিয়া এলাকায় মাইক্রোবাস আর মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে ১৯ বছরের মাহমুদুল হাসান মিরাজ আর ১৫ বছরের মোহাম্মদ ইউসুফ মারা যায়। খেজুরের রস খাইয়া ফিরার পথে তাগো জীবন থাইম্যা যায়।

২৬ জানুয়ারি একই এলাকায় মোটরসাইকেল আর পিকআপ ভ্যানের সংঘর্ষে ১৬ বছরের আবির হোসেন মারা যান। কম বয়সী মোটরসাইকেল আরোহীদের মৃত্যুও গত এক বছরের দুর্ঘটনার উল্লেখযোগ্য অংশ।

ডিসেম্বরেও সড়ক আছিল প্রাণঘাতী। ১৩ ডিসেম্বর সিংগাইর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ট্রাকের চাকায় পিষ্ট অইয়া মারা যায় নয় বছরের শিশু জাহিদ ইবনে জামান।

অক্টোবরেও কয়েকটা বড় দুর্ঘটনা ঘটে। ১৮ অক্টোবর ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে আলাদা দুইটা দুর্ঘটনায় দুই মোটরসাইকেল আরোহী মারা যান। ২৯ অক্টোবর শিবালয়ের আড়পাড়া এলাকায় বাস নিয়ন্ত্রণ হারাইয়া উল্ট্যা গেলে চালকসহ তিনজন মারা যান। আহত অইছিলেন অন্তত ২০ জন।

মোটরসাইকেলেই বড় ঝুঁকি

গত এক বছরের ঘটনাগুলায় সবচাইতে চোখে পড়ার বিষয় অইল মোটরসাইকেল। নিহতদের এ্যাক্টা বড় অংশই মোটরসাইকেল চালক বা আরোহী। কখনো ট্রাকের লগে সংঘর্ষ, কখনো বাসের ধাক্কা, কখনো নিয়ন্ত্রণ হারাইয়া রাস্তার পাশের খুঁটিতে আঘাত, আবার কখনো অন্য মোটরসাইকেলের লগে সংঘর্ষে প্রাণ গেছে।

৮ মে সাটুরিয়ায় তিন বন্ধু, ১২ মার্চ এ্যাক্টা দম্পতি, ২ জানুয়ারি দুই শিক্ষার্থী আর ২৬ সেপ্টেম্বর মা-মেয়ের মৃত্যুর মতো ঘটনাগুলা দেহাইতেছে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা খালি এ্যাকজন আরোহীর জীবন কাইড়া নেয় না। অনেক সময় একসঙ্গে পরিবারের একাধিক মাইনষেরে হারাইতে অয়।

কোন সড়কে বেশি?

প্রকাশিত ঘটনাগুলায় সবচাইতে বেশি বার আইছে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের নাম। শিবালয়, সদর আর আশপাশের এলাকায় এই মহাসড়কে বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান আর মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে একাধিক প্রাণহানি অইছে। নতুন কইরা জাগীর সেতুর ঘটনাডাও এই মহাসড়কের ঝুঁকির কতা সামনে নিয়া আসছে।

এরপর বারবার আইছে হেমায়েতপুর-সিংগাইর-মানিকগঞ্জ আঞ্চলিক সড়ক। সিংগাইর বাসস্ট্যান্ড, গেড়াদিয়া, মেদুলিয়া আর আশপাশের এলাকায় ট্রাক, পিকআপ, মাইক্রোবাস, সিএনজি আর মোটরসাইকেলের দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে।

সাটুরিয়া আর ঘিওরের আঞ্চলিক সড়কগুলাতেও প্রাণহানির একাধিক ঘটনা পাওয়া গেছে। বিশেষ কইরা মোটরসাইকেল আর ভারী যানবাহনের মুখোমুখি সংঘর্ষ এইহ্যানে উদ্বেগের কারণ অইয়া উঠছে।

সময় কী কইতেছে?

প্রকাশিত ঘটনাগুলায় দুর্ঘটনার নির্দিষ্ট সময় পাওয়া যায়, এইরহম বেশির ভাগ ঘটনাই হকাল থিকা দুপুরের মইধ্যে ঘটছে। তয় সন্ধ্যা আর রাইতেও প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটছে। নতুন ঘটনাডাও সন্ধ্যার সময়ই ঘটছে।

এই লাইগ্যা খালি এ্যাক্টা নির্দিষ্ট সময়ডারে ঝুঁকিপূর্ণ কইরা চিহ্নিত করার মতো পুরাপুরি তথ্য এই সংবাদভিত্তিক তালিকা থিকা পাওয়া যায় না। তয় এ্যাক্টা বিষয় পরিষ্কার, দুর্ঘটনা খালি গভীর রাইতে ফাঁকা রাস্তায় অইতেছে না। ব্যস্ত দিনের বেলাতেও মহাসড়ক আর আঞ্চলিক সড়কে মাইনষে প্রাণ হারাইতেছেন।

সংখ্যার পেছনে যে মাইনষেগুলা

সড়ক দুর্ঘটনার খবর সাধারণত কয়েক লাইনের। ‘নিহত’, ‘আহত’, ‘উদ্ধার’, ‘হাসপাতাল’, এই কয়টা কথাতেই খবর শেষ অইয়া যায়। তয় ওই কয়েক লাইনের বাইরেও থাইগ্যা যায় এ্যাক্টা পরিবারের দীর্ঘ গপ্পো।

কেউ হকালে মোটরসাইকেল নিয়া বাইর অইছিলেন। কেউ সন্তানের হাত ধইরা গরে ফিরতেছিলেন। কেউ ফলের ভ্যান নিয়া বাজারে যাইতেছিলেন। কেউ বন্ধুদের লগে বাইর অইছিলেন। কেউ আছিলেন শিক্ষার্থী, যার সামনে আছিল পড়াশোনা আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন।

২৬ সেপ্টেম্বরের মা-মেয়ের মৃত্যুতে এ্যাকজন বাবা একসঙ্গে স্ত্রী আর সন্তান হারাইছেন। ১২ মার্চের দুর্ঘটনায় এ্যাক্টা পরিবার হারাইছে স্বামী-স্ত্রী দুইজনকেই। ২ জানুয়ারির দুর্ঘটনায় দুই শিক্ষার্থীর পরিবার হারাইছে তাগো ভবিষ্যতের স্বপ্ন। ৮ মে সাটুরিয়ায় তিন বন্ধুর মৃত্যুতে কয়েকটা পরিবার একসঙ্গে শোকের মইধ্যে পইড়া গেছে।

আর ৪ অক্টোবর জাগীর সেতুর দুর্ঘটনায় বর্ষার মৃত্যু আবারও দেহাইয়া দিল, সড়কের ঝুঁকি খালি মোটরসাইকেল বা ব্যক্তিগত গাড়ির আরোহীদের লাইগ্যাই না। রিকশায় চলাচল করা মাইনষের জীবনও এই ঝুঁকির মইধ্যে আছে।

এইগুলা খালি পরিসংখ্যান না। প্রতিটা সংখ্যার পেছনে আছে এ্যাক্টা নাম, এ্যাক্টা পরিবার আর ম্যালা অসমাপ্ত গপ্পো।

মানিকগঞ্জের সড়কে দুর্ঘটনার পেছনে একাধিক কারণ আছে। ভারী যানবাহনের লগে ছোট যানবাহনের সংঘর্ষ, মোটরসাইকেলের ঝুঁকিপূর্ণ চলাচল, দ্রুতগতির যান, উল্টো পথে গাড়ি চালানো, চালকের নিয়ন্ত্রণ হারানো আর মহাসড়কে স্থানীয় মাইনষের চলাচল বারবার বিভিন্ন প্রতিবেদনে আইছে।

সবচাইতে বড় পুশ্ন অইল, একই সড়কে বারবার দুর্ঘটনা ঘটার পরও ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলা কতটা নিরাপদ করা অইতেছে?

এ্যাক্টা দুর্ঘটনার পর কয়েক ঘণ্টা রাস্তা বন্ধ থাকে, আহতদের হাসপাতালে নিয়া যাওয়া অয়, মরদেহ স্বজনদের কাছে তুইলা দ্যাওয়া অয়। এরপর রাস্তা আবার স্বাভাবিক অইয়া যায়। তয় যে পরিবারডা মাইনষে হারায়, তাগো জীবন আর কোনোদিন স্বাভাবিক অয় না।

মানিকগঞ্জের সড়কগুলা তাই খালি যোগাযোগের পথ না, মাইনষের জীবন-জীবিকারও পথ। এই পথডা যেন মৃত্যুর পথ না অইয়া যায়, এইডাই এখন সবচাইতে জরুরি।

কারণ সড়কে এ্যাক্টা দুর্ঘটনা হয়তো কয়েক মিনিটের ঘটনা। তয় হেই দুর্ঘটনার শোক এ্যাক্টা পরিবাররে বইতে অয় সারাজীবন।