বালিয়াটি প্রাসাদ থেইকা তেওতা, একদিনের ঘুরাঘুরি


ঢাকার কাছেই এমন একটা জেলা আছে, যেইহানে একদিনের ঘোরাঘুরিতেই দ্যাখা যায় জমিদারি আমলের স্থাপত্য, পুরান প্রাসাদ, নবরত্ন মঠ আর নদীপাড়ের গেরামের জীবন। হেই জেলা অইল মানিকগঞ্জ। বিশেষ কইরা বালিয়াটি প্রাসাদ আর তেওতা জমিদারবাড়ি একসঙ্গে ঘুইরা দ্যাখলে মানিকগঞ্জের ইতিহাস আর ঐতিহ্যের বড় একটা অংশ খুব কাছ থেইকা চেনা যায়।

একদিনের ছুটিতে তাই খুব ভোরে ঢাকা থেইকা রওনা দিয়া বালিয়াটি প্রাসাদ দিয়া ভ্রমণ শুরু করা যায়। এরপর দুপুরের পর তেওতার দিকে রওনা। দিনের শেষটা অইতে পারে যমুনার পাড়ে খাঁড়াইয়া সূর্য ডোবার দৃশ্য দেইখা।

হকালটা শুরু অউক বালিয়াটি দিয়া

মানিকগঞ্জ শহর থেইকা প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে সাটুরিয়া উপজেলার বালিয়াটি গেরামে আছে ঐতিহাসিক বালিয়াটি প্রাসাদ। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ঊনবিংশ শতকে বানানো এই জমিদারবাড়ি প্রায় ১৬ হাজার ৫৫৪ বর্গমিটার জায়গাজুড়ে ছড়াইয়া আছে। প্রাসাদ চত্বরে আছে সাতটা ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা।

প্রবেশপথেই দুইটা সিংহের মূর্তি দর্শনার্থীদের স্বাগত জানায়। ভিতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে বড় সবুজ আঙিনা আর ফুলের বাগান। পাশাপাশি খাঁড়াইয়া থাকা বহুতল ভবনগুলার স্থাপত্য, কারুকাজ আর বড় বড় ঘর এখনো হেই সময়ের জমিদারি জাঁকজমকের কথা মনে করাইয়া দেয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রাসাদে মোট ২০০টা কক্ষ আছে আর প্রতিটা কক্ষেই নানা ধরনের কারুকাজ দ্যাখা যায়।

প্রাসাদের মাঝামাঝি একটা ভবন ‘রংমহল’ নামে পরিচিত। এহন হেইখানে জাদুঘর আছে। তাই শুধু পুরান স্থাপনা দেইখাই ফিরা আসতে অয় না, প্রাসাদের ইতিহাস আর আগের দিনের নানা নিদর্শন সম্পর্কেও জানার সুযোগ মেলে।

বালিয়াটি প্রাসাদ এহন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষণ আর ব্যবস্থাপনায় আছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল থেইকা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হেইটা সকাল ১০টা থেইকা সন্ধ্যা ৬টা আর অক্টোবর থেইকা মার্চ পর্যন্ত সকাল ৯টা থেইকা বিকেল ৫টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের লাইগ্যা খোলা থাকে। তয় সাপ্তাহিক বন্ধ আর সরকারি ছুটির দিনের সময়সূচি মাথায় রাইখ্যা যাওনের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য যাচাই কইরা নেওয়াই ভালো।

বালিয়াটিতে শুধু প্রাসাদ না

বালিয়াটি ঘুরতে গেলে আশপাশের ঐতিহ্যও দ্যাখা যায়। প্রাসাদের কাছেই আছে রামকৃষ্ণ মিশন সেবাশ্রম। মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯১০ সালে শ্রী রাধিকা চরণ অধিকারী, যিনি পরে স্বামী সুন্দরানন্দজী মহারাজ নামে পরিচিত হন, এই সেবাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। হেইখানে মন্দিরের পাশাপাশি একটা গ্রন্থাগারও আছে।

প্রাসাদ ঘুইরা আশপাশটা দেইখা এবার দুপুরের খাওনের পালা। স্থানীয় কোনো বালো খাবারের দোকানে সহজ-সরল খাবার খাইয়া তেওতার উদ্দেশে রওনা দেওয়া যায়। একদিনের ভ্রমণে সময় বাঁচাইতে দুপুরের খাওন খুব বেশি লম্বা না করাই বালো।

এরপর তেওতার পথে

বালিয়াটি থেইকা এবার যাইতে অইব মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার তেওতায়। তেওতা জমিদারবাড়ি পদ্মা-যমুনা নদীঘেরা এই এলাকার ইতিহাসের আরেক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। সরকারি জেলা পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী, তেওতা জমিদারবাড়িতে মোট ৫৫টা কক্ষ আছে। বাড়িডা দীর্ঘদিনের ইতিহাসের সাক্ষী অইয়া এখনো খাঁড়াইয়া আছে।

তয় বালিয়াটির চাইতে তেওতার বর্তমান চেহারা আলাদা। সময়ের লগে প্রাসাদের অনেক অংশ জরাজীর্ণ অইয়া গেছে। তাই হেইখানে গেলে ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনায় ওঠানামা কিংবা ভিতরে ঢোকার সময় সাবধান অইতে অইব।

তেওতা মানেই শুধু জমিদারবাড়ি না

তেওতার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলার একটা অইল হেইখানকার ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলার সমষ্টি। তেওতা জমিদারবাড়ির কাছেই আছে নবরত্ন মঠ। তেওতা ইউনিয়নের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মঠডার উচ্চতা প্রায় ৭৫ ফুট। জমিদারবাড়ির পূর্বদিকে আছে লালদিঘী, দক্ষিণ পাশে আছিল বড় কাচারিঘর আর মঠের পশ্চিমদিকে আছে পুকুরঘাট।

এই পুরা এলাকা ঘুইরা দ্যাখলে বোঝা যায়, একসময় তেওতা শুধু একটা জমিদারবাড়ি আছিল না। হেইটা আছিল একটা বড় জমিদারি কেন্দ্র। বসতবাড়ি, কাচারিঘর, পুকুর, উপাসনালয় আর অন্য নানা স্থাপনা মিলাইয়া গইড়া উঠছিল আলাদা এক জগত।

নজরুল-প্রমীলার স্মৃতিও আছে হেইখানে

তেওতার লগে জড়াইয়া আছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম আর প্রমীলা দেবীর স্মৃতি। প্রমীলা দেবীর পৈতৃক ভিটা তেওতা গেরামে আছিল। তেওতা ইউনিয়নের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রমীলা দেবী ১৯০৮ সালে তেওতা গেরামে জন্মগ্রহণ করেন আর শৈশবের একটা সময় হেইখানে কাটান। নজরুলের লগে তাঁর সম্পর্ক আর পরের বিয়ের ইতিহাসের লগেও তেওতার নাম জড়াইয়া আছে।

তাই তেওতা ঘুরতে গেলে শুধু জমিদারি স্থাপত্য না, বাংলা সাহিত্য আর নজরুল-প্রমীলার জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের লগেও পরিচয় অয়।

শেষ বিকালটা যমুনার পাড়ে

তেওতা জমিদারবাড়ির পশ্চিমদিকে তেওতা বাজারসংলগ্ন এলাকায় যমুনা নদী আছে। সরকারি স্থানীয় তথ্যেও তেওতার লগে যমুনার ঘনিষ্ঠ ভৌগোলিক সম্পর্কের কথা কওয়া অইছে।

তাই ভ্রমণের শেষটা নদীর পাড়ে রাখাই যায়। বিকালের আলো যখন ধীরে ধীরে নরম অইয়া আসে, তখন নদীর পাড়ে খাঁড়াইয়া সারাদিন দেইখা আসা ইতিহাসরে নতুন কইরা অনুভব করা যায়। একদিকে কয়েকশ বছরের পুরান স্থাপনা, আরেকদিকে নদীর চলমান পানি। একটা অতীতের সাক্ষী, আরেকটা প্রতিনিয়ত বদলাইতে থাকা প্রকৃতির গল্প।

কেমনে যাইবেন

বালিয়াটি প্রাসাদে যাইতে ঢাকার গাবতলী থেইকা মানিকগঞ্জ কিংবা সাটুরিয়াগামী বাসে যাওয়া যায়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সাটুরিয়া হইয়া বালিয়াটি যাওয়া সুবিধার। সাটুরিয়া থেইকা স্থানীয় অটোরিকশা কিংবা সিএনজি নিয়া প্রাসাদে পৌঁছানো যায়।

তেওতা যাইতে ঢাকার দিক থেইকা আরিচা ঘাট হইয়া সড়কপথে যাওয়া যায়। মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসনের পর্যটন তথ্য অনুযায়ী, আরিচা থেইকা সিএনজি কিংবা রিকশায় তেওতায় যাওয়া যায়। নদীপথেও তেওতায় পৌঁছানোর সুযোগ আছে।

একদিনে দুইডা জায়গা ঘুরতে চাইলে ব্যক্তিগত গাড়ি কিংবা রিজার্ভ গাড়ি নিলে সময় ম্যানেজ করা সহজ অইব। গণপরিবহনে গেলে যাতায়াতে বেশি সময় লাগতে পারে। আর ভ্রমণের আগে বালিয়াটি প্রাসাদ খোলার দিন আর সময় অবশ্যই যাচাই কইরা নেওন ভালো।

লগে কী কী রাইখবেন

আরামদায়ক কাপড়চোপড় আর জুতা, পানির বোতল, দরকারি ওষুধ, ছাতা আর মোবাইলের চার্জার লগে রাইখা ভালো। পুরান স্থাপনায় ঘোরার সময় দেয়াল কিংবা কারুকাজে হাত না দেওয়া আর প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের ক্ষতি অয়, এমন কোনো কাম না করাই উচিত।

একদিনের এই ভ্রমণে আসলে শুধু দুইডা জমিদারবাড়ি দ্যাখা অয় না। বালিয়াটিতে দ্যাখা যায় জমিদারি আমলের জাঁকজমক, তেওতায় পাওয়া যায় ইতিহাসের ক্ষয় আর সময়ের ছাপ, আর যমুনার পাড়ে খাঁড়াইয়া বোঝা যায় প্রকৃতির চলমান গপ্পো।

তাই যারা ঢাকার কাছাকাছি একদিনের মইধ্যে ইতিহাস, স্থাপত্য, সাহিত্য আর নদীর সৌন্দর্য একসঙ্গে দ্যাখতে চান, তাগোর লাইগ্যা মানিকগঞ্জের বালিয়াটি থেইকা তেওতা অইতে পারে একটা পুরাপুরি ঐতিহ্যভ্রমণের পথ।