মানিকগঞ্জের মাঠে এখন আখ কাটার মৌসুম চলতেছে। কোনোহ্যানে কৃষক-শ্রমিকেরা ব্যস্ত আখ কাটতেছেন, কোনোহ্যানে আবার পাতা আর আঁশ পরিষ্কার কইরা আঁটি বাঁধার কাম চলতেছে। খেত থিকা কাটা আখ যাইতেছে স্থানীয় হাটবাজারে। আবার পাইকারদের হাত ধইরা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার বাজারেও পৌঁছাইতেছে। ভালো ফলন আর চাহিদা থাকায় এইবার আখ চাষে লাভের আশা করতেছেন কৃষকেরা। তয় কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া যাইব কি না, হেই চিন্তাও আছে তাগো মইধ্যে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে মানিকগঞ্জের সাত উপজেলায় ৫১০ হেক্টর জমিতে আখ চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা অইছিল। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা আছিল ২৫ হাজার ২৪৫ টন। শেষ পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়াইয়া ৫২৪ হেক্টর জমিতে আখের আবাদ অইছে। সিংগাইর, সাটুরিয়া আর সদর উপজেলায় আখের চাষ বেশি। ঘিওর, শিবালয় আর দৌলতপুরের বিভিন্ন এলাকাতেও আখের আবাদ আছে।
মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার রমনপুর আর পাথরাইল গ্রামের মাঠে এইবার বেশ বড় পরিসরে আখের চাষ দেহা গেছে। ১৯ আগস্টের এক প্রতিবেদনে কওয়া অইছে, হেইহ্যানে এক বিঘা জমিতে আখ চাষে ২০ থিকা ২৫ হাজার ট্যাকা খরচ কইরা মৌসুম শেষে প্রায় এক লাখ টাকার আখ বিক্রির আশা করতেছেন কৃষকেরা। একই জমিতে মুলা, গাজর, ধনেপাতা, লালশাকসহ অন্য ফসল চাষ কইরা বাড়তি আয়ও করতেছেন কেউ কেউ।
তয় ব্যাবাক কৃষকের খরচ আর আয় এক না। ১৩ আগস্টের আরেক প্রতিবেদনে সদর উপজেলার তরা এলাকার কৃষক আবদুল মান্নান জানাইছেন, এক বিঘা জমিতে আখ চাষে তার প্রায় ৩০ হাজার ট্যাকা খরচ অইছে। আখের লগে মুলা, ধনেপাতা আর লালশাক চাষ কইরা বাড়তি আয়ও করছেন তিনি। এর মইধ্যে খেত থিক্যাই প্রায় ৫০ হাজার টাকার আখ বিক্রি কইরা ফেলছেন।
সিংগাইরের চিত্রও বেশ আশাব্যঞ্জক। উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে হেইহ্যানে প্রায় ২৯৮ হেক্টর জমিতে আখ চাষ অইছে, যেইডা আগের বছরের চাইতে ১৮ হেক্টর বেশি। এই মৌসুমে সিংগাইরে প্রায় ৩১ কোটি টাকার আখ বিক্রির সম্ভাবনা আছে। আখ চাষের লগে সরাসরি আর পরোক্ষভাবে জড়িত প্রায় এক হাজার কৃষক। বায়রা ইউনিয়নে আবাদ অইছে সবচাইতে বেশি।
সিংগাইরের আলীনগর গ্রামের কৃষক আনোয়ার হোসেন এইবার ১০ বিঘা জমিতে আখ চাষ করছেন। তার হিসাবে, প্রতি বিঘায় খরচ অইছে ৫০ থিকা ৬০ হাজার ট্যাকা। বর্তমানে এক বিঘার আখ এক লাখ থিকা এক লাখ ৪০ হাজার ট্যাকা পর্যন্ত বিক্রি অইতেছে। মানে, ভালো বাজার পাইলে খরচ বাদ দিয়া উল্লেখযোগ্য লাভ করার সুযোগ আছে।
আখের দাম অবশ্য জাত, আকার আর মানের ওপর বদলায়। সদর উপজেলার তরা এলাকার পাইকারদের তথ্য অনুযায়ী, খেত থিকা প্রতি আখ ২০ থিকা ৪০ ট্যাকা দরে কেনা অইতেছে। অন্যদিকে সিংগাইরের কৃষকেরা কন, খেতে ভালো মানের এ্যাক্টা আখ ৩০ থিকা ৪০ ট্যেকায় বিক্রি অইলেও বিভিন্ন হাত ঘুইরা হেই আখ ভোক্তার কাছে ৭০ থিকা ১০০ ট্যাকা পর্যন্ত দামে পৌঁছাইতেছে। কৃষকদের কতা, উৎপাদন খরচের লগে বাজারদরের এই ব্যবধান তাগো লাইগ্যা চিন্তার বিষয়।
তয় পাইকারদের কতা কিছুটা আলাদা। তাগো দাবি, কৃষকের কাছ থিকা আখ কেনার পর পরিবহন, শ্রমিকসহ বিভিন্ন খরচ যোগ অয়। এই লাইগ্যা খুচরা বাজারে দাম বাড়ার পেছনে খালি ব্যবসায়ীর মুনাফারে দায়ী করা ঠিক না। সিংগাইরে আখ কাটার সময় প্রতি হাজার আখে শ্রমিক খরচ ২ হাজার ২০০ থিকা ২ হাজার ৫০০ ট্যাকা পর্যন্ত পড়ে বইলা স্থানীয় প্রতিবেদনে কওয়া অইছে।
আখ চাষের বড় সুবিধা অইল, একই জমিতে সাথি ফসল চাষ করা যায়। আখের জমিতে মুলা, ধনেপাতা, লালশাক, গাজরসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করতেছেন কৃষকেরা। ফলে আখ বিক্রির আগেই জমি থিকা আরেক দফা আয় করার সুযোগ অইতেছে। কৃষি বিভাগও কৃষকের আয় বাড়াইবার এ্যাক্টা উপায় হিসাবে এই পদ্ধতিতে উৎসাহ দিতেছে।
মানিকগঞ্জ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার দ্যাওয়া তথ্য অনুযায়ী, খালি সদর উপজেলাতেই বর্তমানে ১৫৭ হেক্টর জমিতে আখের আবাদ অইছে। কৃষকদের তামাক চাষ থিকা ফিরাইয়া আখ আর সাথি ফসল চাষে উৎসাহ দেওয়ার পরিকল্পনাও নেওয়া অইছে। আধুনিক জাত আর বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে চাষের ব্যাপারেও কৃষকদের পরামর্শ আর সহযোগিতা দ্যাওয়ার কথা জানাইছে কৃষি বিভাগ।
তয় আখের সম্ভাবনার লগে সমস্যাও আছে। আখ দীর্ঘমেয়াদি ফসল অওয়ায় ম্যালা সময় জমি ধইরা রাখতে অয়। এই সময় পর্যাপ্ত শ্রমিক না পাওয়া, সার-বীজসহ কৃষি উপকরণের দাম আর কাঙ্ক্ষিত বাজারদর না পাওয়া নিয়া কৃষকদের অভিযোগ আছে।
সদর উপজেলার রঙ্গনপুর এলাকার কৃষক আব্দুর রহমান জানাইছেন, জমি বর্গা নেওয়া থিকা চাষাবাদ পর্যন্ত তার প্রায় ৫০ হাজার ট্যাকা খরচ অয়। ভালো দাম পাইলে প্রায় এক লাখ ট্যাকায় আখ বিক্রি করা সম্ভব বইলা আশা তার।
আবার দীর্ঘমেয়াদি ফসল অওয়ায় শ্রমিক সংকট আখচাষিদের লাইগ্যা বড় চ্যালেঞ্জ অইয়া উঠতেছে বইলা জানাইছেন একই এলাকার কৃষক শাহিনুর রহমান। তার কতা, সময়মতো পর্যাপ্ত শ্রমিক না পাওয়া আর অনেক সময় ঠিকঠাক বাজারদর না পাওয়ার কারণে কৃষকেরা আখ চাষ থিকা আগ্রহ হারাইতে পারেন।
তয় সব মিলাইয়া চলতি মৌসুমে আখের আবাদ কমে নাই, বরং নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাও ছাড়াইয়া গেছে। কৃষি বিভাগের ভাষ্য, আধুনিক জাত, উন্নত চাষপদ্ধতি আর সাথি ফসলের মাধ্যমে কৃষকের আয় বাড়াইতে পারলে মানিকগঞ্জে আখের আবাদ আরু বাড়ানো সম্ভব।
মানিকগঞ্জের আখ তাই এখন খালি মাঠের এ্যাক্টা মিষ্টি ফসল না, ম্যালা কৃষকের কাছে বাড়তি আয়ের এ্যাক্টা সম্ভাবনাও। এক বিঘায় কয়েক দফা খরচ সামলাইয়া ভালো ফলন আর ভালো দাম পাইলে কৃষকের হাতে লাভ থাকে। তয় হেই লাভ নিশ্চিত করতে উৎপাদন খরচ, শ্রমিকের মজুরি আর বাজারদরের মইধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই এখন বড় বিষয়।
মাঠে আখের ফলন যেমন ভালো অইছে, কৃষকের প্রত্যাশাও ত্যাম্বাই। ফলনের লগে এইবার যেন ন্যায্য দামও মেলে, হেই আশায় বুক বাঁইধা আছেন মানিকগঞ্জের আখচাষিরা।